প্রকাশের তারিখ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্বপ্নে'র মতো সুপারশপ যেভাবে ভোক্তাদের ঠকায়
ভোক্তা অধিকার, আইন ও নীতিমালার আলোকে একটি অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ ঝকঝকে আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, সুবিন্যস্ত তাক, হাসিমুখে কর্মচারী—সব মিলিয়ে আধুনিক সুপারশপ যেন মধ্যবিত্ত ও শহুরে মানুষের কাছে “স্বপ্নের বাজার”। কিন্তু এই স্বপ্নের আড়ালে কি ভোক্তা,বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বা কনজিউমাররা ধীরে ধীরে প্রতারিত হচ্ছেন? প্রশ্নটি আজ আর আবেগের নয়; এটি যুক্তি, আইন ও নীতির আলোকে যাচাইয়ের দাবি রাখে।মূল্য-ভ্রান্তি ও ‘পারসেপশন ট্র্যাপ’সুপারশপগুলোর একটি বড় কৌশল হলো মূল্যকে বাস্তবের চেয়ে কম মনে করানো। ‘৳৯৯’, ‘৳১৯৯’—এমন মনস্তাত্ত্বিক মূল্য নির্ধারণ (Psychological Pricing) ভোক্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ ক্রেতারা দামের শেষ অঙ্কের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, পুরো মূল্যের দিকে নয়। অথচ পাশের খোলা বাজারে একই পণ্য হয়তো কম দামে পাওয়া যায়। এটি সরাসরি প্রতারণা না হলেও ভোক্তার উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি কৌশল।অফার ও ডিসকাউন্টের ফাঁদ‘Buy 1 Get 1’, ‘Mega Sale’, ‘Limited Offer’—এই শব্দগুলো জিউমারদের মধ্যে FOMO (Fear of Missing Out) তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অফার দেওয়ার আগে পণ্যের মূল মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়, পরে “ছাড়” দেখানো হয়।বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ধারা ৪৪ অনুযায়ী, ভ্রান্ত বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এই ধারা প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় সুপারশপগুলো প্রায় দায়মুক্ত থেকে যায়।মেয়াদোত্তীর্ণ ও রি-প্যাকেজড পণ্যআরেকটি স্পর্শকাতর অভিযোগ হলো মেয়াদোত্তীর্ণ বা মেয়াদ ঘনিয়ে আসা পণ্য নতুন প্যাকেজে সাজিয়ে বিক্রি। জিউমাররা ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিংয়ের প্রতি বেশি আস্থাশীল হওয়ায় অনেক সময় লেবেল বা এক্সপায়ারি ডেট ভালোভাবে যাচাই করেন না।এটি শুধু ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।ডিজিটাল ডেটা ও আচরণগত শোষণসুপারশপের লয়্যালটি কার্ড, অ্যাপ বা ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে জিউমারদের ক্রয়-আচরণের ডেটা সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই ডেটা ব্যবহার করে টার্গেটেড অফার, নোটিফিকেশন ও বিজ্ঞাপন পাঠানো হয় যা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় প্রলুব্ধ করে।বাংলাদেশে এখনও শক্তিশালী ডেটা প্রোটেকশন আইন কার্যকর না হওয়ায় এই আচরণ প্রায় অনিয়ন্ত্রিত।আইন আছে, প্রয়োগ নেই এটাই মূল সমস্যাভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, নিরাপদ খাদ্য আইন, বিজ্ঞাপন নীতিমালা সবই কাগজে আছে। কিন্তু মনিটরিং, জরিমানা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব সুপারশপগুলোর অনৈতিক চর্চাকে উৎসাহিত করছে। জিউমাররা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তা আইনি অভিযোগে রূপ নেয় খুব কমই।উপসংহার: স্বপ্ন ভাঙার নয়, সচেতন হওয়ার সময়সব সুপারশপই প্রতারক এমন বলা যেমন ভুল, তেমনি “সব ঠিক আছে” বলাও আত্মপ্রবঞ্চনা। জিউমারদের আবেগ, ডিজিটাল নির্ভরতা ও ব্র্যান্ড-আস্থাকে পুঁজি করে যে সূক্ষ্ম শোষণ চলছে, তা আইনি সংস্কার, কঠোর প্রয়োগ ও ভোক্তা সচেতনতা ছাড়া থামবে না।স্বপ্নের সুপারশপ তখনই সত্যিকারের স্বপ্ন হবে, যখন লাভের চেয়ে নৈতিকতা আর ভোক্তার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল এ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত