প্রকাশের তারিখ : ২৭ মার্চ ২০২৬
জবি শিক্ষার্থীর ভাবনায় পর্যটনের আড়ালে লোকসংস্কৃতির কবর
লোকজ সংস্কৃতি কোনো সাজানো মঞ্চের প্রদর্শনী নয়, বরং এটি আমাদের নাড়ির স্পন্দন এবং হাজার বছরের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আধুনিক পর্যটন শিল্পের চাকচিক্যে আমরা কি অজান্তেই আমাদের এই প্রাণভোমরাকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করছি? উন্নয়নের দোহাই দিয়ে শেকড়কে উপড়ে ফেলার এই নিরব আয়োজন নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম জাহান খুশবু তুলে ধরেছেন এক তীক্ষ্ণ ও সময়োপযোগী বিশ্লেষণ। তার এই লেখাটি আমাদের পর্যটন ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক সংকটের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে, যা প্রতিটি সচেতন মানুষের ভাবনার খোরাক যোগাবে।পর্যটনের নামে লোকজ সংস্কৃতির কবরলিখেছেন: তাসনিম জাহান খুশবুশিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়লোকজ সংস্কৃতি কোনো প্রদর্শনীর বস্তু নয়, কোনো উৎসবের মৌসুমি সাজও নয়। এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে গাঁথা এক জীবন্ত প্রবাহ—যেখানে আনন্দ আছে, বেদনা আছে, বিশ্বাস আছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমে থাকা স্মৃতি আছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ এই লোকজ সংস্কৃতি পর্যটনের নামে ধীরে ধীরে তার প্রাণ হারাচ্ছে। উন্নয়নের আলোয় আলোকিত করার বদলে আমরা যেন নিজ হাতে কবর দিচ্ছি আমাদের শিকড়কে।পর্যটন বনাম নিজস্ব সংস্কৃতিপর্যটন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি—সব দিক থেকেই পর্যটনের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পর্যটন উন্নয়ন কি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে সম্মান করছে, নাকি তা ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে?প্রদর্শনী বনাম জীবনপ্রবাহলোকজ সংস্কৃতি কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগের ফল নয়। এটি গড়ে উঠেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, বিশ্বাস, শ্রম ও আনন্দের মধ্য দিয়ে। বাউল গান ছিল আত্মসাধনার ভাষা, পালাগান ছিল সমাজের সুখ–দুঃখ বলার মাধ্যম, নকশিকাঁথা ছিল নারীর অনুভূতির নীরব প্রকাশ। এসব সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছিল কোনো মঞ্চের আলোয় নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে, মানুষের উঠোনে, নদীর ধারে।কিন্তু পর্যটনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে লোকজ সংস্কৃতিকে আজ আলাদা করে “দেখানোর জিনিস” বানানো হচ্ছে। পর্যটনকেন্দ্রে নির্দিষ্ট সময়সূচিতে লোকজ গান বা নৃত্য পরিবেশন করা হয়, যেখানে শিল্পীর জীবনবাস্তবতা বা দর্শনের কোনো জায়গা থাকে না। সংস্কৃতি তখন আর স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহের অংশ থাকে না, হয়ে ওঠে সাজানো প্রদর্শনী।শিল্পীর রূপান্তর ও পরিবেশের বিপর্যয়এই প্রক্রিয়ায় লোকজ শিল্পীর অবস্থানও বদলে যাচ্ছে। তিনি আর সমাজের প্রতিনিধি নন, বরং দর্শকের বিনোদনের মাধ্যম। পর্যটকদের রুচি অনুযায়ী গান বদলাতে হয়, পোশাক পাল্টাতে হয়। এতে লোকজ সংস্কৃতির গভীরতা হারিয়ে যায়, থাকে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য।পর্যটনের নামে সংস্কৃতির বিকৃতির পাশাপাশি ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্রামবাংলার নদীপাড়, হাওর বা পাহাড়ি অঞ্চল দখল করে গড়ে উঠছে রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। যেখানে একসময় বসতো গ্রাম্য আসর, সেখানে আজ ঢুকে পড়ছে কংক্রিট ও কৃত্রিম বিনোদন।ধারাবাহিকতার সংকট ও উত্তরণের পথলোকজ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা। কিন্তু পর্যটননির্ভর সংস্কৃতিতে তরুণ প্রজন্ম লোকজ সংস্কৃতিকে জীবনের অংশ হিসেবে নয়, বরং অর্থ উপার্জন বা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেখতে শুরু করছে।তবে পর্যটন সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। পরিকল্পিত ও সংবেদনশীল পর্যটন লোকজ সংস্কৃতিকে টিকিয়েও রাখতে পারে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, সংস্কৃতির মৌলিক রূপ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা থাকলে পর্যটন লোকজ সংস্কৃতির সহায়ক শক্তি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, লাভের অঙ্কটাই বড় হয়ে ওঠে।লোকজ সংস্কৃতি কোনো অতীত নয়, এটি আমাদের চলমান পরিচয়। পর্যটনের নামে এই পরিচয়কে ধ্বংস করা মানে আত্মবিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। উন্নয়ন যদি নিজের শিকড় কাটার নাম হয়, তবে সেই উন্নয়ন আমাদের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়—সে প্রশ্ন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল এ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত