পটুয়াখালীর সাগরকন্যা কুয়াকাটায় ভোজনরসিকদের চমকে দিয়েছেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা। বেকারত্বের অভিশাপ কাটিয়ে তাঁরা শুরু করেছেন ভিন্নধর্মী খাদ্য ব্যবসা খরগোশের বারবিকিউ।
শুরুটা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হলেও, ইতিমধ্যেই এই নতুন আইটেমে দারুণ সাড়া পড়েছে পর্যটক ও স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যে।
৭নং লতাচাপলি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দিয়ার আমখোলা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মোঃ ফাইজুল মল্লিক জানান, “আমরা দু’জনই বেকার ছিলাম। একদিন বন্ধুর সাথে বসে ভাবছিলাম, এলাকায় কীভাবে কিছু করা যায়। তখন মাথায় আসে কুয়াকাটায় তো কেউ খরগোশের বারবিকিউ করে না! খরগোশ তো হারাম না, তাই ভাবলাম এটা শুরু করলে ভালোই হবে। এখন الحمد لله (আলহামদুলিল্লাহ) ভালো সাড়া পাচ্ছি।”
তার সহযোগী বন্ধু ইব্রাহিম জানান, “খরগোশের বারবিকিউতে মানুষ আগ্রহী হচ্ছে। প্রতিদিন বিকেলে দোকান খোলার পর থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতার ভিড় থাকে। আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে আরও ভালো ব্যবসা হবে।”
মো.ফাইজুল ও তার বন্ধু ইব্রাহিম কুয়াকাটার ফিশ ফ্রাই মার্কেটে “ফ্রেন্ডস বারবিকিউ অ্যান্ড ফিশ ফ্রাই” নামে দোকান চালু করেছেন। এখানে সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি নতুন সংযোজন হিসেবে খরগোশ ও কোয়েল পাখির বারবিকিউ বিক্রি হচ্ছে। নানা মশলা, সস ও সুগন্ধি মেরিনেশনে তৈরি এই বিশেষ খাবার ভোজনরসিকদের আকৃষ্ট করছে দারুণভাবে।
এক ক্রেতা জানান, “খরগোশ হালাল প্রাণী, ইসলাম ধর্মে এটি খাওয়া জায়। খেতে অনেক সুস্বাদু, তাই কৌতূহলবশত খেয়েছি সত্যিই অসাধারণ।”
ঢাকায় খরগোশের বারবিকিউ পরিচিত হলেও, কুয়াকাটায় এটি একেবারে নতুন উদ্যোগ। পর্যটকদের মতে, এ ধরনের নতুন খাবার পর্যটন অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
ফিশ ফ্রাই মার্কেটের সভাপতি বলেন, “এই দোকানে প্রথমবারের মতো খরগোশের বারবিকিউ চালু হয়েছে। ভালো সাড়া পেলে ভবিষ্যতে আরও দোকান এ আইটেম বিক্রি শুরু করবে।”
খরগোশের বৈধতা প্রসঙ্গে উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)এর সভাপতি কেএম বাচ্চু প্রতিবেদনের মাধ্যমে বলেন, “বন্য খরগোশ ধরা বা বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে খামারে উৎপাদিত বা গৃহপালিত খরগোশ বিক্রি ও খাওয়ায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই এ উদ্যোগ আইনসঙ্গত এবং প্রশংসনীয়।”
(চ্যানেল এ) এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, উদ্যোক্তা মো.ফাইজুল মল্লিক আগে ঢাকায় একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। পরে চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে এসে বন্ধুর সঙ্গে নতুন কিছু করার চিন্তা থেকে এ উদ্যোগ নেন।
টোয়াক (ট্যুরিস্ট অর্গানাইজেশন অব কুয়াকাটা)-এর সদস্য আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, “খরগোশের মাংস খাওয়া ইসলামে জায়েজ। আলেম-ওলামাদের কাছ থেকেও আমরা এ বিষয়ে জেনেছি।”
ফাইজুলের ছোট ভাই মোঃ আমানুল্লাহ ইসলাম, যিনি রাজাপুর দারুল উলুম কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন বলে জানিয়েছেন এবং বর্তমানে মেশকাত জামাতের ছাত্র, তিনি কোরআন ও হাদীসের আলোকে খরগোশের মাংসের বৈধতা ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন, “কোরআনে সরাসরি খরগোশের নাম উল্লেখ নেই, তবে আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে হালাল ও হারাম প্রাণীর সীমা নির্ধারণ করেছেন -
‘তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে সমস্ত উত্তম জিনিস, আর হারাম করা হয়েছে নাজায়েজ ও অপবিত্র বস্তু।’
(সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৪)
অর্থাৎ, যেসব প্রাণী নাপাক, হিংস্র বা মাংসাশী নয় তাদের মাংস খাওয়া বৈধ। খরগোশ যেহেতু তৃণভোজী প্রাণী এবং হিংস্র নয়, তাই এ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে এটি হালাল হিসেবে বিবেচিত।”
তিনি আরও শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন:
প্রাণীটি হালাল উপায়ে (বিসমিল্লাহ বলে) জবাই করতে হবে।
বন্য খরগোশ অবৈধভাবে শিকার করা যাবে না, কারণ তা আইন ও পরিবেশের দৃষ্টিতে অপরাধ।
খামারে বা গৃহপালিত খরগোশ বৈধ উপায়ে জবাই করলে তা খাওয়া সম্পূর্ণভাবে হালাল।
মোঃ আমানুল্লাহ ইসলামের এই ব্যাখ্যা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগকে ধর্মীয় দিক থেকেও সমর্থন দিয়েছে।
তবে এই দুই তরুণের সাহসী উদ্যোগ কেবল তাদের বেকারত্ব দূর করেনি, বরং কুয়াকাটার পর্যটন এলাকায় নতুন খাদ্য সংস্কৃতিরও সূচনা করেছে।
আপনার মতামত লিখুন