জীবন আর জীবিকার তাগিদে ২০০৩ সালে চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার উজানি গ্রাম থেকে মরুভূমির দেশ কুয়েতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মাওলানা হেলাল উদ্দিন আল-হাসান। দীর্ঘ দুই দশকের কঠোর পরিশ্রম, ঘাম ঝরানো উপার্জন আর তিল তিল করে জমানো স্বপ্নগুলো আজ বালির বাঁধের মতো ধসে পড়েছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এক বিজাতীয় প্রতারণার জালে আটকে তিনি আজ শুধু নিঃস্বই নন, বরং সামাজিকভাবেও চরম বিপর্যস্ত। প্রবাসের সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে এবং দ্বিতীয় বিয়ের নামে ভয়াবহ জালিয়াতির শিকার হয়ে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা এখন ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
কুয়েতে প্রথম জীবনে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে মাওলানা হাসান সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। তার সাজানো গোছানো একটি সুখী পরিবার ছিল বাংলাদেশে, যেখানে তার স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান (চার ছেলে ও এক মেয়ে) রয়েছে। কিন্তু প্রথম স্ত্রীর অসুস্থতার পরিপ্রেক্ষিতে পারিবারিক সম্মতিতে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্তই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। কুয়েতে পরিচয় হওয়া এক মধ্যবয়সী নারীর প্ররোচনায় তার দেশে থাকা মেয়ে রাবেয়া সুলতানা আঁখির সঙ্গে ঘরোয়াভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন হাসান। এরপর দ্বিতীয় স্ত্রী রাবেয়া সুলতানা আখিকে কুয়েতে নিয়ে আসেন তিনি।
মাওলানা হাসান জানান, বিয়ের সময় আঁখিকে 'অবিবাহিত' দাবি করা হলেও পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন এটি ছিল আঁখির তৃতীয় বিয়ে, যা তার কাছে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
প্রতারণার জালটি আরও বিস্তৃত হয় ২০২২ সালের দিকে। হাসানের শাশুড়ি রহিমা বেগম (ফাতেমা) জমি বিক্রির টোপ দিয়ে হাসানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন। একটি অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে জমির সম্পূর্ণ দাম পরিশোধ করলেও রেজিষ্ট্রি করে দিতে শুরু হয় টালবাহানা। এক পর্যায়ে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাসানকে প্রাণনাশের হুমকিও প্রদান করা হয়। প্রতিকার পেতে হাসান কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শরণাপন্ন হন এবং স্থানীয় আদালতে মামলা করেন। কুয়েতের আদালত হাসানের পক্ষে রায় দিয়ে বিবাদী আঁখিকে ৩৭১৮.৭০০ কুয়েতি দিনার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা) পরিশোধের নির্দেশ দেন। কিন্তু মানবিকতার খাতিরে এবং স্ত্রীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে হাসান সেই অর্থ আদায় না করেই দূতাবাসে করা একটি আপোষনামার ভিত্তিতে আঁখিকে দেশে ফেরার সুযোগ করে দেন। এমনকি ফেরার সময় তাকে দামী আইফোন ও স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে বিদায় জানান।
তবে দেশে ফেরার পরই আঁখি তার আসল রূপ ধারণ করেন। কুয়েতে করা সব অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তিনি হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে মাওলানা হাসান জানতে পারেন, তার দ্বিতীয় স্ত্রী বর্তমানে জনৈক রুনা নামক এক মহিলার সাথে সমকামিতার সম্পর্কে জড়িয়ে স্বাভাবিক সাংসারিক জীবন শুরু করেছেন, এমনকি পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ করে এই অনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছেন আখি ও রুনা।
যার প্রমাণ হিসেবে ভয়েস রেকর্ড ও বিভিন্ন নথিপত্র হাসানের সংগ্রহে রয়েছে বলে হাসান দাবি করেন।
হাসান বলেন,এখানেই শেষ নয়, তাকে "হাসানকে" সামাজিকভাবে হেনস্তা করতে আঁখি ও তার মা উল্টো হাসানের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও যৌতুকের মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন।
হাসানের পরিবার জানায়, সাভারের ব্যাংক টাউন এলাকায় বসবাসকারী এই চক্রটির মূল লক্ষ্যই ছিল হাসানের কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পদ আত্মসাৎ করা। বর্তমানে মাওলানা হেলাল উদ্দিন আল-হাসান তার জমি, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার হারিয়ে প্রায় দিশেহারা। বিভিন্ন স্থানে কুৎসা রটনার ফলে তিনি এক চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
মাওলানা হাসান আক্ষেপ করে বলেন, "আমি কুয়েত থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দেশে সেই অভিযোগ নিয়ে যখন তদন্তের কথা ওঠে, তখন স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী নেতারা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। আমার শাশুড়ি প্রকাশ্যে বলে বেড়ান, 'পুলিশ-প্রশাসন আমাদের কেনা, হাসান কুয়েতে বসে চিৎকার করলে কিছু হবে না।' একজন প্রবাসীর জন্য দেশের আইন কি তবে কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?"
হাসান আরও বলেন, "আমি আল্লাহর দ্বীনের খেদমত করি, শিশুদের কোরআন শেখাই। আজ আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি শুধু আমার কষ্টের টাকা আর জমি ফিরে পেতে চাই। আমি রাষ্ট্রের কাছে এই প্রতারক চক্রের সুষ্ঠু বিচার চাই।"
আপনার মতামত লিখুন