ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় জমে উঠেছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেষ মুহুর্তে এসে প্রার্থীরা বিরামহীনভাবে নাওয়া খাওয়া ভূলে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রার্থীরা তাদের কর্মী সমর্থক নিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। যতই ভোটের দিন এগিয়ে আসছে ততই জমে উঠছে ভোটের লড়াই。
এই আসনে মূলত ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য মুশফিকুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী মো. আতাউর রহমান সরকারের প্রচারণা রয়েছে চোখে পড়ার মতো। এই দু’দলের মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডা হাড্ডি。
এবার ভোটের সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। কে হবেন এ আসনের প্রতিনিধি, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা এখনো তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ১৭ বছর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা অনেক ভোটার বলছেন, এবার প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখেই ভোট দেবেন। আবার কেউ কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীর অতীত কর্মকান্ড ও রাজনৈতিক পরিচ্ছন্নতাকে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। অন্য দলগুলোর পক্ষে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন ভোটারদের একটি বড় অংশ।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকলেও এখনো অনেক ভোটার প্রকাশ্যে তাদের পছন্দের কথা বলছেন না। ফলে ভোটের হিসাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জটিল হয়ে উঠেছে। এ আসনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় এই আসনটি ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালের পর থেকে আসনটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। এতে বিএনপির ভোটব্যাংকে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে দলটি মাঠ ছাড়েনি। হাসিনা সরকারের ভোট ডাকাতি, জালিয়াতি ও রাতের ভোটের কারণে বিএনপি সুবিধা করতে পারেনি। তবুও আশা ছাড়েনি তারা। এবার তাদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন।
কিন্তু সেই প্রত্যাশার গুড়ে বালি ঢেলেছে জামায়াতে ইসলামী। এই আসনে জামায়াত আগে বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল। এবার তারা এককভাবে নির্বাচন করছেন। ইতিমধ্যে তারা আসনটিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ফলে বিএনপি ও তাদের হারানো আসন ধরে রাখতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। কে কতটা জনপ্রিয়, তা স্পষ্ট হবে আগামী ১২ তারিখের ভোটে।
পৌর শহরের মসজিদ পাড়া এলাকায় চায়ের দোকানে কথা হয় মো. মজিবুর রহমানের সাথে।
তিনি বলেন, এবার বিএনপির প্রার্থী এমপি হওয়া খুবই কঠিন। কারণ জামায়াতের সঙ্গে কঠিন লড়াই করেই জয়ী হতে হবে। কারণ আমরা দেখছি বিএনপির মধ্যে অনেক নেতাকর্মী কিছুটা দুরে দুরে অবস্থান করছেন। তাছাড়া এক সময় যারা বিএনপির ভোটার ছিল তারা এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। মানুষের রুপ চেনা খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভোটার আলমাছ মিয়া বলেন, দীর্ঘ বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার কাঙ্খিত প্রাথীকে ভোট দেবো। অনেক দলের লোকজন আসছে। তবে প্রার্থী নয় প্রতীক দেখে ভোট দিতে চাই।
অটোচালক বাদল মিয়া বলেন, অনেক কিছু দেখেছি। এবার একটু ভিন্নভাবে ভাবছি। হিসাব-নিকাশ করেই ভোট দেবো। কারণ হিসেবে বলেন, আগে যাদের ভোট দিয়েছেন তারা পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ ক্ষমতায় আসার আগেই দাপট দেখাচ্ছে। শান্তির লক্ষে শান্তিপ্রিয় মানুষকে ভোট দিতে চাই। যার দ্বারা এলাকার উন্নয়ন হবে। সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে সব সময়।
ভোটার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা যাদের কারণে ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি, অনেক দলের নেতারা এখন তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলছেন। আমরা আর দেশকে পিছনের দিকে নিতে চাই না ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন চাই। যাকে ভোট দিলে নিরাপদে থাকা যাবে তাকে ভোট দিব।
বিএনপি প্রার্থী মুশফিকুর রহমান বলেন আমি চাই এলাকার উন্নয়ন। দীর্ঘ বছর এই এলাকার জনগন উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল। বিগত সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করেছে। এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের। মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়ন চায়। আমি জনগণের দোয়ায় তাদের সেই প্রত্যাশার প্রতিনিধিত্ব করতে চাই এবং সবসময় মানুষের পাশে থাকতে চাই।
তিনি আরো বলেন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর আমি যখন ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছি, তখন তারা আমার আগের কাজের প্রশংসা করছেন এবং আশা প্রকাশ করছেন আমি নির্বাচিত হলে উন্নয়নমূলক কাজ করব। তিনি তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি তুলে ধরেন। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও সরাসরি সহায়তা, নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত পরিবর্তন এবং মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি। জনগণের দোয়া ও সমর্থন আমার সঙ্গে আছে- আমি আশাবাদী বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।
জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী মো. আতাউর রহমান সরকার বলেন, প্রতিটি পাড়া মহল্লায় আমরা নিরলসভাবে প্রচার প্রচারণা করছি। এলাকায় ভোটারদের ভালো সারা পাচ্ছি। বিগত সময়ে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা উন্নয়নের নামে ব্যাপক লুটপাট করেছে। মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমরা ন্যায়বিচার ও ইনসাব ভিত্তিক রাস্ট্র পরিচালনা করতে চায়। এজন্য চায় সকলের দোয়া ও সহযোগীতা।
তিনি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় এলে নদী-নালা, খাল-বিল সংরক্ষণ ও রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি যুব সমাজের জন্য উচ্চশিক্ষায় বিনামূল্যে স্কলারশিপ প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা খাতের আধুনিকায়ন, পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্স সংযোজন, রাস্তাঘাট সংস্কার এবং এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করা হবে। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠন এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের ইশতেহার কেবল এক টুকরো কাগজ নয়, এটি আপনাদের সাথে করা আমাদের পবিত্র আমানত। জনগণের দোয়া ও সমর্থন আমার সঙ্গে আছে- জনগন আমাকে যে সারা দিচ্ছে আমি আশাবাদী এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।
এ আসনের অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন: মো. জসিম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), জহিরুল হক খান (জাতীয় পার্টি), শাহীন খাঁন (জাতীয় নাগরিক পার্টি), জহিরুল হক চৌধুরী (গণ অধিকার পরিষদ) রাফি উদ্দিন (ইনসানিয়াত বিপ্লব )। তারও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন।
আপনার মতামত লিখুন