ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় গবাদিপশুর মারাত্মক সংক্রামক রোগ ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (FMD), স্থানীয়ভাবে খুরা রোগ, মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনে কয়েক হাজার গরু ও মহিষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। ভাইরাসজনিত এ রোগের নির্দিষ্ট কার্যকর ওষুধ না থাকায় ছোট-বড় অন্তত ৪৭০টি খামার চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রান্তিক খামারি ও কৃষকরা পড়েছেন দিশেহারা অবস্থায়。
খুরা রোগ অত্যন্ত ছোঁয়াচে। একটি আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এলে দ্রুত অন্য পশুতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। জেলা জুড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা; মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। আক্রান্ত পশুর শরীরে প্রথমে জ্বর দেখা দেয়, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা ঝরে, মুখগহ্বর ও খুরে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে পশু দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, খাবার গ্রহণ ও জাবর কাটা বন্ধ করে দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে মৃত্যুও ঘটছে বলে খামারিরা জানিয়েছেন。
কসবা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার খামারি ইসলাম উদ্দিন মাস্টার বলেন, “আমার খামারে ১২টি গরু আছে। এর মধ্যে ৫টি খুরা রোগে আক্রান্ত, বেশির ভাগই হাইব্রিড বাছুর। জ্বর হচ্ছে, মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। চিকিৎসা করাতে অনেক খরচ হচ্ছে, অথচ ওষুধও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।”
সৈয়দাবাদ গ্রামের খামারি মহন মিয়া বলেন, “এই রোগে গরু খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়, দ্রুত ওজন কমে যায়। আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, দ্রুত FMD ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করে সরবরাহ করা হোক।”
খামারিদের অভিযোগ, আক্রান্ত পশুর পাশে সুস্থ পশু রাখলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক খামারি এখনো আক্রান্ত পশুকে আলাদা করে রাখা সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। এছাড়া চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষকরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
খামারিদের একটি অংশের দাবি, শীত মৌসুমে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করে আসা গরুর মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও একই ধরনের প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কসবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তারেক মাহমুদ বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। ৪ হাজারের বেশি পশুকে FMD ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, পরিচর্যা পদ্ধতি ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত পশুকে নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভ্যাকসিন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে. গরু আক্রান্ত হলে খামারিদের প্রথমে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে
প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, খুরা রোগ প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান, আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, খামারে জীবাণুনাশক ব্যবহার এবং বাইরের পশুর অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অন্যথায় এ প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ, পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহ ও ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য প্রণোদনা সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আপনার মতামত লিখুন