বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জ রুটে এখন আর যাত্রী সেবার চিহ্ন নেই। এখানে চলছে মাদক, চাঁদাবাজি আর ‘পুলিশি প্রহরায়’ টিকিটবিহীন যাত্রী পরিবহনের মহোৎসব। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, স্টেশনের ভেতরে খোদ পুলিশ সদস্যদের চোখের সামনেই চলছে মরণনেশা ইয়াবার কারবার, অথচ তারা কেবল টাকার নেশায় মত্ত।
অনুসন্ধানকালে আমাদের র্টিম যখন প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করছিলেন, তখন দেখা যায় কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের লোকেরা প্রকাশ্য দিবালোকে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করছে। বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দায়িত্বরত দুই পুলিশ সদস্য—কনস্টেবল সোহেল এবং সিনিয়র কনস্টেবল জামাল উদ্দিনকে অবহিত করা হলেও তাদের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক।
মাদক বিক্রির তথ্য দেওয়ার পর তারা সাংবাদিকদের বলেন, "আপনারা আগে যান, আমরা আসছি।" কিন্তু পরবর্তীতে সাংবাদিকরা মাদক কারবারিকে হাতেনাতে ধরলেও ওই দুই কনস্টেবল ঘটনাস্থলে আসেননি।
হুমকি ও পুলিশের তাচ্ছিল্য: একপর্যায়ে মাদক কারবারিরা সাংবাদিকদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয় এবং পকেট থেকে সুইচ গিয়ার (ছুরি) বের করে হামলার চেষ্টা চালায়। পুনরায় পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানানো হলে তারা চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে বলেন— "হ্যান্ডকাপ আছে, পারলে আপনারাই ধরে থানায় নিয়ে যান"। এই বলে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে চলে যান। এই ঘটনায় নেটিজেনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং ওই দুই কনস্টেবলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
টিকিটহীন যাত্রী ও ‘৩০০-৪০০’ টাকার গোপন চুক্তি
স্টেশনের পুলিশ বক্স ও তথ্য কেন্দ্রে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে পুলিশ সদস্যদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হলেও, ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসামাত্রই তাদের 'তৎপরতা' বহুগুণ বেড়ে যায়।
গেট থেকেই যাত্রী শিকার: কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা পর্যন্ত সিট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পুলিশ সদস্যরা ৩-৪ জন যাত্রী নিয়ে গ্রুপ তৈরি করেন।
টাকা লেনদেন: সরকারি টিকিটের তোয়াক্কা না করে মাথাপিছু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে এই যাত্রীদের ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। এই টাকার কোনো রসিদ বা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার প্রমাণ মেলেনি।
এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা নিয়ে মুখ খুলেছেন খোদ স্টেশন কর্তৃপক্ষ।
স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমান জানান: "বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য। কতিপয় কিছু পুলিশ সদস্য গেটের মুখ থেকেই ৪-৫ জন যাত্রী একসাথে করে (অবৈধভাবে) নিয়ে যায়। গতকাল আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রত্যেকের টিকিট চেক করেছি যাতে এই অনিয়ম ঠেকানো যায়।"
এদিকে, পুলিশের এই বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) মো. বাহাউদ্দিন ফারুকীর সাথে কথা বলতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। সাব ইন্সপেক্টর (SI) শাহজাহান বিষয়টি শুনে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। এবং সাংবাদিকদের বলেন , ওসি মহোদয়,
অফিসের কাজে দুই দিনের জন্য বাইরে আছেন। তবে জনমনে বড় প্রশ্ন—নিচের স্তরের পুলিশ সদস্যদের এই ওপেন চাঁদাবাজি ও মাদক সংশ্লিষ্টতা কি ওসির অগোচরে হচ্ছে, নাকি তিনি দেখেও না দেখার ভান করছেন?
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। সাধারণ যাত্রীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। কনস্টেবল সোহেল ও জামাল উদ্দিনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত এবং মাদক সম্রাট জাহাঙ্গীরের সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন